





গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা একজন নারীর জন্য অন্যতম অপরিহার্য প্রসবপূর্ব পরিচর্যা। যদি কোনো গর্ভবতী নারী রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে ব্যর্থ হন, তবে তার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে।
যদিও এটি নিরাময়যোগ্য, তবুও এটি ভবিষ্যতে শিশু এবং মায়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা জানাটা সুস্থ থাকতে ও পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি, যা আপনার সন্তান এবং আপনাকে ভবিষ্যতের জটিলতা থেকে রক্ষা করবে।
গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন।
নিম্নলিখিত চার্টটি গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার স্বাভাবিক পরিসীমা উপস্থাপন করে:
| গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা | |
| ডায়াবেটিস পরীক্ষার সময় | রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা |
| খাবার গ্রহণের ১ ঘন্টা পর | ১৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে |
| খাবার গ্রহণের ২ ঘন্টা পর | ১২০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে |
| উপবাস | ৬০-৯৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার |
উপরের সারণিতে গর্ভাবস্থায় গ্লুকোজের স্বাভাবিক মাত্রা দেখানো হয়েছে। চিকিৎসার ইতিহাস এবং ডাক্তারের পরামর্শের মতো বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
যদি কোনো গর্ভবতী মহিলার ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে, তবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য তার লক্ষ্যমাত্রা, ডায়াবেটিসের ইতিহাস নেই এমন মহিলার থেকে ভিন্ন হবে। তাই, আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত এবং গর্ভাবস্থায় প্রস্তাবিত রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখা উচিত।
গর্ভবতী মহিলাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। কোনো মহিলার ডায়াবেটিসের পূর্ব ইতিহাস না থাকলেও, গর্ভাবস্থায় তার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সেরে যায়, কিন্তু এটি আপনার শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে আপনার টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দুই প্রকারের হয়: টাইপ ১ এবং টাইপ ২। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের নিয়ম মেনে এই অবস্থাটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তবে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওষুধ এবং ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্ত করার জন্য আপনার ডাক্তার গর্ভাবস্থায় একটি রক্ত পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষাটি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সাহায্য করে । যাঁরা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন না, তাঁদের অবশ্যই নিম্নলিখিত বিস্তারিত রক্ত পরীক্ষাগুলো করাতে হবে:
এই পরীক্ষাটি এক-ঘণ্টার গ্লুকোজ টলারেন্স বা গ্লুকোজ স্ক্রিনিং টেস্ট নামেও পরিচিত। এই পদ্ধতিতে, গর্ভবতী মহিলা একটি মিষ্টি তরল পান করেন এবং এক ঘণ্টা পর ডাক্তার তার বাহু থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে ডাক্তার গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট করার পরামর্শ দেবেন।
এটি দুই-ঘণ্টা বা তিন-ঘণ্টার গ্লুকোজ পরীক্ষা নামেও পরিচিত। গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্টে অস্বাভাবিক ফলাফল পেলে ডাক্তাররা এই পরীক্ষাটি করার পরামর্শ দেন। যে গর্ভবতী মহিলারা গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট করাবেন, তাদের পরীক্ষার আগে আট ঘণ্টা উপবাস থাকতে হবে। এই প্রক্রিয়ায়, আপনি মিষ্টি জাতীয় পানীয় গ্রহণ করার পর স্বাস্থ্যকর্মী এক, দুই বা তিন ঘণ্টার ব্যবধানে আপনার রক্ত সংগ্রহ করবেন।
আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে এবং আপনি গর্ভধারণের কথা ভেবে থাকেন, তবে পরিকল্পনা করা এবং আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা অপরিহার্য। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে গর্ভাবস্থার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন, তার কিছু পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
যদি আপনার এবং আপনার সঙ্গীর সন্তান ধারণে অসুবিধা হয়, তবে আরও মূল্যায়নের জন্য আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করুন।
ডায়াবেটিসের কারণে কখনও কখনও লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা বা বন্ধ্যাত্বের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে, তাই এই সমস্যাগুলো আগেভাগে সমাধান করলে একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা এবং তার ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পরিকল্পনা এবং সহায়তা এক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য গড়ে তোলে।
একজন গর্ভবতী মহিলা গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং প্রসবপূর্ব যত্নকে সর্বোত্তম করতে আরপিএম (রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং) ব্যবহার করতে পারেন। এটি গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না গিয়েই ক্রমাগত তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মতো সহ-অসুস্থতার কারণে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণকারী মহিলাদের জন্য আরপিএম (RPM) সুবিধাজনক, কারণ এটি তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে এবং যেকোনো পরিবর্তনে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক গ্লুকোজের মাত্রা জানার জন্য একটি চার্ট থাকা আবশ্যক, বিশেষ করে যেসব মহিলারা রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং (RPM) ব্যবহার করেন। এই চার্টে বিভিন্ন সময়ে, যেমন খালি পেটে এবং খাবার পর, রক্তে গ্লুকোজের স্বাস্থ্যকর মাত্রা উল্লেখ করা থাকে। গর্ভবতী মহিলারা এই চার্টের সাহায্যে নিজেদের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে পরামর্শ করে নিজেদের পরিচর্যার পরিকল্পনা সমন্বয় করতে পারেন।
যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য এই চার্টটি খাওয়ার পর গ্লুকোজের মাত্রা খুব বেশি না খুব কম, তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও নির্দেশনা দেয়, যেমন—স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বাড়ানো বা অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়া।
আরপিএম (RPM) এবং রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রার চার্ট ব্যবহার করা ছাড়াও, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গর্ভবতী মহিলাদের অবশ্যই সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ অনুসরণ করতে হবে। এখানে আপনি যা করতে পারেন:
গর্ভবতী মহিলাদের সুষম খাদ্যতালিকায় অবশ্যই শস্যদানা, ফল, শাকসবজি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর শর্করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে তাদের খাদ্যতালিকায় সম্পৃক্ত চর্বি এবং অতিরিক্ত চিনির পরিমাণও সীমিত রাখতে হবে।
গর্ভবতী মহিলাদের রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে এবং ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়াতে মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত। আপনার যদি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকে, তবে প্রতিদিন ন্যূনতম ৩০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা আবশ্যক। তবে, যেকোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে আপনাকে অবশ্যই আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করতে হবে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এমন একটি অবস্থা যেখানে গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এটি সাধারণত গর্ভাবস্থার দ্বিতীয়ার্ধে দেখা দেয় এবং প্রায়শই অলক্ষিত থেকে যায়। এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক কার্যকলাপের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।