জ্বর হলে কী কী খাওয়া উচিত নয়?
শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে সাধারণত ক্ষুধা কমে যায়, কিন্তু দ্রুত সেরে ওঠার জন্য খাওয়া-দাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে, সঠিক খাবার খেলে দ্রুত সেরে ওঠার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়, অপরদিকে অন্য খাবার পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে বা সেরে উঠতে দেরি করাতে পারে।
জ্বর ও দুর্বলতায় কী খাবেন আর কী খাবেন না, তা নিয়ে ভাবছেন? বিস্তারিত জানতে এই ব্লগটি পড়তে থাকুন।
জ্বর ও দুর্বলতায় কী খাবেন?
যখন আপনি জ্বর এবং দুর্বলতার সাথে লড়াই করছেন, তখন সঠিক পুষ্টি আপনার শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। জ্বরের সময় পুষ্টি ও জলশূন্যতা থেকে মুক্ত থাকতে কী কী খাবেন, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. ঝোল
- অসুস্থ থাকাকালীন মুরগি, গরুর মাংস বা সবজির ঝোল একটি দারুণ বিকল্প। এটি পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করে এবং গলা ব্যথা উপশম করে। এছাড়াও, এর উষ্ণতা কফ দূর করে শ্বাস-প্রশ্বাস সহজ করে তোলে।
২. মুরগির স্যুপ
- অসুস্থদের জন্য চিকেন স্যুপ একটি চিরাচরিত প্রতিকার। এটি আপনাকে শক্তি জোগাতে প্রয়োজনীয় তরল, ইলেক্ট্রোলাইট এবং প্রোটিন সরবরাহ করে। এর ঝোল শরীরের তরলের ঘাটতি পূরণ করে এবং তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে, অন্যদিকে মুরগির মাংস থেকে পাওয়া প্রোটিন ও জিঙ্ক আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
- সুতরাং, যদি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে যে জ্বরের সময় মুরগির মাংস খাওয়া যায় কিনা, তাহলে উত্তর হলো হ্যাঁ।
৩. রসুন
- রসুন তার অ্যান্টিভাইরাল গুণের জন্য পরিচিত। এটি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে সাহায্য করতে পারে। এর স্বাস্থ্য উপকারিতা পুরোপুরি পেতে আপনি আপনার খাবারে রসুন যোগ করতে পারেন অথবা কাঁচাও খেতে পারেন।
৪. ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার
- আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কড লিভার অয়েল, স্যামন মাছ এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ দুধের মতো খাবারগুলো এর চমৎকার উৎস। এছাড়াও, ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ফ্লু এবং কোভিড-১৯ সহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৫. দই
- দই প্রোবায়োটিকের একটি সমৃদ্ধ উৎস, যা আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। জীবন্ত সক্রিয় কালচার, ভিটামিন ডি এবং খুব কম পরিমাণে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত দই বেছে নিন।
৬. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি
- কমলা, কিউই এবং ব্রকলির মতো ফল ভিটামিন সি-তে ভরপুর, যা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি শক্তিশালী পুষ্টি উপাদান। আপনার খাবারে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করলে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা হতে পারে।
৭. শাকসবজি
- পালং শাক এবং কেলের মতো পাতাযুক্ত শাকসবজি ভিটামিন এ, সি, ই এবং কে-তে ভরপুর, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সহজে ও পুষ্টিকর উপায়ে শরীরকে চাঙ্গা করতে এগুলো স্মুদি বা স্যুপে যোগ করুন।
৯. ব্রকলি
- ব্রকলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী পুষ্টি উপাদানের আরেকটি চমৎকার উৎস, যার মধ্যে ভিটামিন সি এবং ই অন্তর্ভুক্ত। এটি ক্যালসিয়াম এবং ফাইবারেও ভরপুর। এটি কাঁচা খেলে বা আপনার স্যুপে যোগ করলে তা আপনার আরোগ্য লাভে সহায়তা করতে পারে।
১০. ওটমিল
- অসুস্থ অবস্থায় এক বাটি গরম ওটমিল বেশ আরামদায়ক। এটি জিঙ্ক, কপার এবং ফাইবারের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে ভরপুর, যা আরোগ্য লাভের সময় আপনার শরীরকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
১১. মশলা
- আদা ও হলুদের মতো মশলায় প্রদাহ-বিরোধী গুণ রয়েছে যা উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। আপনার চা বা স্যুপে এগুলো যোগ করলে নাক বন্ধ থাকা ও অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
১২. পোল্ট্রি ও মাছ থেকে প্রোটিন
- জ্বর হলে প্রোটিন অত্যন্ত জরুরি। মুরগি ও মাছ হলো প্রোটিনের সহজপাচ্য উৎস। স্যামনের মতো তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে, যা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে।
জ্বর ও দুর্বলতার সময় কী খাওয়া উচিত নয়?
জ্বরের সময় যেমন সঠিক খাবার খাওয়া জরুরি, তেমনি দ্রুত সেরে ওঠার জন্য ভুল খাবার এড়িয়ে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্দি বা জ্বর হলে খাওয়ার জন্য সবচেয়ে খারাপ খাবারগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. ক্যাফেইনযুক্ত ও অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়
ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল আপনার শরীরকে পানিশূন্য করে তুলতে পারে, তাই যখন ঘামের মাধ্যমে আপনার শরীর থেকে এমনিতেই তরল বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন এই জিনিসগুলো গ্রহণ করা একেবারেই উচিত নয়। শরীরকে আর্দ্র রাখতে এবং আরোগ্য প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট-সমৃদ্ধ পানীয় পান করুন।
২. চিনিযুক্ত খাবার
যদিও আরামদায়ক খাবার খাওয়ার লোভ হতে পারে, ডোনাট এবং কেকের মতো মিষ্টিজাতীয় খাবার আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ আপনার পাকস্থলীতেও অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে শরীরের পক্ষে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. ভাজা ও চর্বিযুক্ত খাবার
ভাজা খাবার এবং চর্বিযুক্ত ফাস্ট ফুডে অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে যা হজম করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন আপনি আগে থেকেই দুর্বল বোধ করছেন। এই খাবারগুলো অস্বস্তিও সৃষ্টি করতে পারে এবং আপনার সেরে ওঠার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
৪. মশলাদার খাবার
ঝাল খাবার, যেমন কাঁচা মরিচ এবং তীব্র ঝালের সস, আপনার গলায় অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং কাশি বা গলাব্যথা বাড়িয়ে তুলতে পারে। ভাইরাল জ্বর থেকে সেরে ওঠার সময় অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।
৫. দুগ্ধজাত পণ্য
দুধ ও পনিরের মতো দুগ্ধজাত খাবার শ্লেষ্মা ঘন করে দিতে পারে, যা নাক বন্ধ হওয়া এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ সীমিত করলে এই উপসর্গগুলো উপশম হতে পারে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস সহজ হতে পারে।
৬. প্রক্রিয়াজাত খাবার
প্রক্রিয়াজাত খাবার, যা প্রায়শই ফাস্ট ফুড এবং তৈরি খাবারে পাওয়া যায়, সেগুলিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কম থাকে। এগুলিতে এমন প্রিজারভেটিভ এবং অ্যাডিটিভও থাকতে পারে যা আপনার শরীরের দক্ষতার সাথে সেরে ওঠার ক্ষমতাকে বাধা দেয়।
৭. অতিরিক্ত সরল শর্করা
ক্যান্ডি, মিষ্টি পানীয় এবং কিছু ফলের রসের মতো খাবারে প্রচুর পরিমাণে সরল শর্করা থাকে যা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গকে দীর্ঘায়িত করতে পারে, ফলে আপনার সেরে ওঠা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বরে কী খাবেন আর কী খাবেন না, তা এখন যেহেতু আপনি জানেন, তাই আপনি সহজেই সেই নির্দিষ্ট খাবারগুলো খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন এবং আপনার আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারেন। এছাড়াও, শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল রাখতে ভুলবেন না, কারণ এটি শরীর থেকে তরলের ঘাটতি পূরণ করতে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।